অ্যাপে না গিয়ে খ্যাপে কেন?

ভোক্তাকণ্ঠ রিপোর্ট: মো. মাহিন সরকার। রাজধানীর আগারগাঁও থেকে জুরাইন যাবেন। মাধ্যম হিসেবে পাঠাও বা উবার রাইড শেয়ার ব্যবহার করতে চান। তার মোবাইলে পাঠাও এবং উবারের অ্যাপ রয়েছে। সে অনুসারে প্রথমে পাঠাও দিয়ে কয়েকজন রাইডারকে রিকুয়েস্ট করেন। তবে কেউ অ্যাপের মাধ্যমে যেতে রাজি নয়। এরপর চেষ্টা করেন উবার অ্যাপের মাধ্যমে। সেখানে একই বিপত্তি। এরপরই রাস্তায় দাঁড়ানো রাইডারদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাদেরকে অ্যাপের মাধ্যমে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তবে কয়েকজন রাইডারকে অনুরোধ করেও কাজে আসেনি। কোনো রাইডারই অ্যাপের মাধ্যমে যেতে রাজি নন। অ্যাপের মাধ্যমে তার গন্তব্যস্থলে যেতে লাগবে ১৮০ টাকা। কিন্তু খ্যাপে বা চুক্তির মাধ্যমে রাইডাররা ভাড়া চাচ্ছেন ২৫০ টাকা। অর্থাৎ অ্যাপের চেয়ে ৭০ টাকা বেশি। অনেকটা বাধ্য হয়েই তিনি চুক্তির মাধ্যমে রাইডারের মোটরসাইকেলে গন্তব্যে রওনা হলেন।

শুধু মাহিন নয়, রাজধানী জুরে এমন অনেকেই এমন ভোগান্তির সঙ্গে ভাড়তি ভাড়া দিয়ে রাইড শেয়ারের মাধ্যমে যাতায়াত করছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাইডাররা অ্যাপের মাধ্যমে যেতে চান না কেন?

রাজধানীর মতিঝিলের জনতা ব্যাংকের সামনে সড়কে দাঁড়িয়ে আছেন বেশি কিছু মোটরসাইকেল রাইডার। দুই/একজন মানুষকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখলেই হাক-ডাক শুরু করেন। কোথায় যাবেন ভাই? শুধু এই মোড়েই নয়, সম্পূর্ণ রাজধানী জুড়েই এমন হাক-ডাক শোনা যায়।

আব্দুর রহিম নামের একজন রাইডারও সেখানে অপেক্ষা করছিলেন যাত্রীর জন্য। তার সঙ্গে কথা হয়, কেন রাইডাররা অ্যাপের মাধ্যমে যেতে চান না? এমন প্রশ্ন শুনে তারও পাল্টা প্রশ্ন, গাড়ি আমার নিজের, তেলও আমাকেই কিনতে হয় অর্থাৎ নিজের, রক্ষণাবেক্ষণ নিজের, মোবাইল নিজের, ইন্টারনেটও নিজের; তাহলে আমি কেন অ্যাপকে পয়সা দেব?

অ্যাপকে কত টাকা দিতে হয়?
রাইড শেয়ারিং সার্ভিস হিসেবে বিআরটিএ-এর তালিকাভুক্ত কোম্পানি ১৫টি। তবে বর্তমানে সেবা দিচ্ছে শুধু উবার এবং পাঠাও। উবার বাংলাদেশে ২৫ শতাংশ হারে কমিশন কেটে রাখে। আর পাঠাও ২০২১ সালের নভেম্বরে ঢাকা রাইড শেয়ারিং ড্রাইভার্স ইউনিয়নের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দুই চাকার বাহনে কমিশনের হার নির্ধারণ করে ১০ শতাংশ। তবে কারে নিচ্ছে ২৫ শতাংশ।

রাইডারের আয়ের হিসেবে অ্যাপ কত পায়?
মাহফুর রহমান নামের আরেক রাইডার ভোক্তাকণ্ঠকে বলেন, ‘দৈনিক মোটরসাইকেল রাইড দিয়ে এক হাজার টাকা আয় করলে উবারে ২৫ শতাংশ হিসেবে ২৫০ টাকা দিতে হবে। অর্থাৎ আমার কাছে থাকবে ৭৫০ টাকা। এর সঙ্গে মোবাইলের ইন্টারনেট ও তেলের খরচ যুক্ত হবে। তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এক হাজার টাকা আয় করতে হলে ৩৫০ টাকার তেল লাগবে। তবে গাড়ি ভেদে কম বেশি হবে। এছাড়া রাজধানীর কোনো কোনো মোড়ে দাঁড়িয়ে যাত্রী নিলে সেখানে চাঁদা দিতে হয় ১০ টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে এক হাজার টাকায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা থাকে। পাঠাওতে ১০ শতাংশ কমিশন দিলে দৈনিক আয় দাঁড়ায় ৫০০ টাকা।’

উজ্জ্বল নামের আরেক রাইডার ভোক্তাকণ্ঠকে বলেন, ‘যাত্রীদের দূরত্ব অনুযায়ী অ্যাপে যে ভাড়া দেখায় তা দিয়ে পোশায় না। এর জন্য খ্যাপে বা চুক্তিতে যাই।’

তবে অ্যাপের পরিবর্তে খ্যাপে যাওয়ায় বিরক্ত যাত্রীরা। তারা বলছেন, রাইডারদের কারণে রাস্তায় দাঁড়ানোও দায়। যাত্রী ভেবে ডাকাডাকি শুরু করে। রাস্তা পার কিংবা ফুটপাতে হাঁটতে প্রায়শই বিরক্ত করা হয়। যদিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও খুব একটা তৎপর হতে দেখা যায়নি রাইডারদের নিয়ন্ত্রণে।

মিরাজ নামের এক যাত্রী ভোক্তাকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম দিকে অ্যাপে মোটরসাইকেল পাওয়া গেলেও এখন তেমন পাওয়া যায় না। এখন মোড়ে মোড়ে রিকশার মতো মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে থাকে। একই দূরত্বে প্রায় সবাই একই ধরনের ভাড়া চায়। এ কারণে আমরা তাদের কাছে অনেকটাই জিম্মি।’

বেলাল নামের আরেক যাত্রী ভোক্তাকণ্ঠকে বলেন, ‘সেবার মান দিন দিন কমছে। ময়লা, দুর্গন্ধ ও অনিরাপদ প্লাস্টিকের বাটি সদৃশ হেলমেট দেওয়া হয়। যেটা মাথায় দিয়েও নিরাপদ মনে হয় না। এছাড়াও বাইক নিয়ে তাদের ভেলকি তো আছেই। আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতাও হয়।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা রাইড শেয়ারিং চালক ইউনিয়ন সেক্রেটারি বেলাল আহমেদ ভোক্তাকণ্ঠকে বলেন, ‘নানা কায়দায় অ্যাপগুলো ২৫ শতাংশ কিংবা তারও বেশি কমিশন কেটে নিচ্ছে। যার কারণে রাইডার সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি অ্যাপেও আগ্রহ কমেছে। কমিশন কমিয়ে যদি রাইড শেয়ারিংকে একটা পর্যায়ে নিয়ে আসা না হয়, তবে এটা মুখ থুবড়ে পড়বে।’

রাইডারদের এমন অভিযোগের বিষয়ে উবার বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চলের প্রধান আলি আরমানুর রহমানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি ভোক্তাকণ্ঠকে বলেন, ‘অনেকের অভিযোগ থাকে কমিশন বেশি কেন? প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত একই কমিশন রয়েছে। টাকার অঙ্কে কমিশন বাড়েনি। আমরা যে কমিশন নিচ্ছি এর মধ্যে সরকারি ট্যাক্স ও ভ্যাট থাকে।’

চুক্তিতে যাওয়ায় নিরাপত্তা কতটুকু?
চুক্তিতে যাওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন অনেক যাত্রী। বিশেষ করে নারী যাত্রীরা। কারণ চুক্তিতে যাওয়া রাইডারদের কোনো তথ্যই পায় না যাত্রীরা। বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেই তাদের তথ্য নেই। যাত্রা পথে কোনো সমস্যা হলে রাইডারের কোনো তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে রাতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি থাকে।

আফরোজা আক্তার নামের এক নারী যাত্রী ভোক্তাকণ্ঠকে বলেন, ‘অ্যাপের মাধ্যমে গেলে রাইডারের তথ্য জানা থাকে। একই সঙ্গে রাইডারের ব্যবহার এবং সেবার মান নিয়ে রেটিং থাকে। এ কারণে অ্যাপে চালানো অনেক রাইডার ভালো আচরণ করতো। কিন্তু চুক্তিতে যাওয়া রাইডারদের এমন কোনো বালাই নেই। অনেক সময় ভাড়া নিয়ে খুব খারাপ আচরণ করে। গন্তব্যস্থল এদিক সেদিক হলেই ভাড়া নিয়ে ঝামেলা শুরু করে দেয়।’

নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চুক্তিতে যাওয়া রাইডারের কোনো নিরাপত্তা নেই। রাতে তো নারীদের যাওয়াই উচিৎ নয়। কিন্তু অনেকেই বাধ্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ রাইডাররা এখন অ্যাপে যেতেই চান না।’

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাত্রীরা অভিযোগ করলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এম সামছুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ভোক্তাকণ্ঠকে বলেন, ‘মোটরসাইকেল বা প্রাইভেটকার রাইড শেয়ারিং পুরো বিশ্বে সফল হলেও বাংলাদেশে এসে তা জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। এই সেবাগুলোর ফাঁকফোঁকর ধরার জন্য দক্ষ ও স্মার্ট জনবল দরকার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটা দেখার জন্য আমাদের এখানে কেউ নেই। সড়কে অব্যবস্থাপনা, দক্ষ লোক ও যথাযথ পর্যবেক্ষণের অভাবে তা সফল হচ্ছে না। সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত সব পক্ষকে সমন্বয় করে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে এর সমাধান করা দরকার।’

-এসআর